Wednesday, April 22, 2020

শোভাবাজার রাজবাড়ির পুজো, বড় ও ছোট পক্ষ

Sovabazar Rajbari

কলকাতার প্রথম দুর্গাপুজো কোনটি?

উত্তর যদি সাবর্ণ রায়চৌধুরীর বাড়ির পুজো হয় তবে সেটি ভুল। ১৬৯৮ সালে ইংরেজরা তিনটি গ্রাম, গোবিন্দপুর, সুতানুটি ও কলকাতা সাবর্ণদের থেকে অধিগ্রহণ করেন। আর সাবর্ণ রায়চৌধুরীর আটচালার পুজোর পত্তন হয় ১৬১০এ। সেদিক থেকে দেখতে গেলে ‘আধুনিক’ কলকাতার থেকেও প্রাচীন এই সাবেকি পুজো। অতএব?




উত্তর জানতে হলে ফিরে যেতে হবে ১৭৫৬-এ। মসনদে তখন বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজদউল্লা। কৃষ্ণনগরের রাজা কৃষ্ণচন্দ্র তখন জমিয়ে দুর্গাপুজো করছেন। রাজা লড়লেন নবাবের বিরুদ্ধে জগতশেঠের বন্ধু হয়ে মীরজাফরের পক্ষে। ১৭৬০ মসনদে এলেন মিরকাসিম, মীরজাফরের জামাই। সন্দেহভাজন মিরকাসিম প্রথমে জগতশেঠকে হত্যা করলেন, পরে জেলে পুরলেন রাজা কৃষ্ণচন্দ্রকে। ইংরেজ সরকারের মধ্যস্থতায়ে সেবার ছাড়া পেলেন রাজা, তবে তত দিনে দুর্গোৎসব শেষ। রাজা স্বপ্নাদেশ পেলেন। সেই থেকে কৃষ্ণনগরে জগদ্ধাত্রী পুজোর শুরু। তত দিনে শহর কলকাতার পসার শুরু হয়ে গেছে। ইংরেজদের উদ্যোগে, রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের অনুকরণে, বার্ষিক উৎসবের মত শুরু হয়েছে জমিদার ও রাজবাড়ির দুর্গোৎসব। এব্যাপারে পথিকৃৎ ছিলেন শোভাবাজারের রাজা নবকৃষ্ণ দেব। ১৭৫৭-এ পলাশীর যুদ্ধের পর প্রথম কলকাতায় পুজো হয় শোভাবাজার রাজবাড়িতে, এখনকার ৩৪ ডি রাজা নবকৃষ্ণ স্ট্রীটে। ভাইপো গোপীমোহন কে পোশ্য নিয়ে এবাড়ির পুজো শুরু করেন রাজা নবকৃষ্ণ। পরে নিজের ছেলে রাজকৃষ্ণের জন্মের পর রাস্তার দক্ষিণে নতুন বাড়ি নিয়ে উঠে যান ৩৩ রাজা নবকৃষ্ণ স্ট্রীটে।



পুরনো রাজবাড়িতে গোপীমোহন বাড়ির কুলপুজোর সুচনা করেন। শ্রী শ্রী গোপীমোহন জিউ আজও বাড়ির ঠাকুর ঘরে নিত্য পূজা পান। মেদিনীপুর থেকে শিল্পীরা আসেন; মিষ্টির ভিয়েন বসে। আগে, গোপীমোহনের সময়ে ৫০-৬০ রকমের মিষ্টি বানানো হত। এখন তা কমে ২০ টি পদে এসে দাড়িয়েছে। এখানে দেবী কন্যা রুপে পুজো পান। ডাকের সাজে সাজানো হয় একচালার এই দেবী প্রতিমাকে। শোনা যায়ে, দেবেরাই প্রথম জার্মানি থেকে রূপোর পাতের সাজ আনাতেন দেবীর আভরনের জন্য; ডাকে করে এই সাজ আসত বলে এর নাম ছিল ডাকের সাজ। এখনো দেবী এখানে অন্য কোন সাজে সজ্জিতা নন, শুধুমাত্র ডাকের সাজ ছাড়া। গোপীমোহনের এই বাড়িতে এক সময় কাশ্মীর, বার্মা (মায়ানমার) থেকে সুন্দরী নর্তকীরা আসতেন। সং আসত। নানান রকমের খেল দেখাত তাঁরা। রনপা-য় চেপে নাচা, কাঁচের বোতল চেবানো, আরও কত কি! সাহেবরা সস্ত্রীক আসতেন সে রঙ্গ উপভোগ করতে। গভীর রাতে সাহেবরা চলে গেলে খাওয়াদাওয়ার পর আবার বসত তাদের আসর। তবে তা চলত সদর দরজা বন্ধ করে। এক ইংরেজ তাঁর কলকাতার পুজ দেখার অভিজ্ঞতায়ে লিখেছিলেন, “রাতে সে বাড়িতে দরজা বন্ধ করে সঙেরা সাহেব-মেম দের নকল করে দেখাত; আর তাই দেখে বাড়ির মেয়ে বউরা আহ্লাদে লুটোপুটি খেত”। খাওয়া-দাওয়া, আমোদ উৎসবে কেটে যেত পুজর চারটি দিন। সন্ধিপুজোর সময় এককালে কামান দাগা হত, সেই রীতি মেনে এখনও ব্ল্যাংক ফায়্যার করা হয় অষ্টমী ও নবমীর সান্ধ্যক্ষণে। নীলকণ্ঠ পাখি উড়িয়ে কৈলাসে দেবীকে ফেরানোর বার্তা পাঠানো হত। সেই প্রাচিন রীতির আদলে, নীলকণ্ঠ পাখির মূর্তি গড়ে তাঁতে প্রাণপ্রতিষ্ঠা করেন শোভাবাজারের ঠাকুরমশাই। দশমীর দিনে দেবীর সাথে বিসর্জনে যায়ে একজোড়া নীলকণ্ঠ পাখির মূর্তি। লর্ড ক্লাইভের দেওয়ান নবকৃষ্ণ রাজাবাহাদুর উপাধি পান। নিয়ম অনুযায়ি সাত হাজার অস্মারোহী সেনা রাখতে পারতেন এই উপাধিধারিরা। বিয়ের সময় এ নিয়ে কন্যাপক্ষ তাঁকে মস্করা করায়ে ফোট উইলিয়াম থেকে চার হাজার সেনা ভাড়া করে খানাকুলে বিয়ে করতে যান রাজাবাহাদুর রাজা নবকৃষ্ণ।







৩৩র রাজা নবকৃষ্ণ ষ্ট্রীটের বাড়িটির ইতিহাস আরও ঝলমলে। শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ও নাচের খুব কদর করতে জানতেন এই রাজবাড়ি। কথিত আছে মা গহনা পড়েন জোড়াসাঁকোর দাঁ বাড়িতে, কুমোরটুলির মিত্র বাড়িতে দ্বি-প্রাহরিক আহার সারেন, আর নৃত্যগীত উপভোগ করেন শোভাবাজারের রাজবাড়িতে। কে আসেননি এই বাড়িতে? লর্ড ক্লাইভ, ওয়ারেন হেস্তিংস, রবীন্দ্রনাথ প্রমুখরা। এন্টোনি ফিরিঙ্গী আর ভোলা ময়রার ঐতিহাসিক কবির লড়াইয়ের সাক্ষী ছিল এই বাড়ি। শিকাগো থেকে ফিরে এখানেই প্রথম বক্তৃতা দেন স্বামী বিবেকানন্দ, সে কিন্তু বাংলায়ে নয়; খাস রাজভাষা ইংরাজিতে। পুজোর সময়ে কলকাতার কয়েকশো বনেদি ও রাজবাড়ির মধ্যে এখানেই ভিড় হয় সবচেয়ে বেশী। এখনো সিংহ দরজার সামনে দাঁড়ানো প্রতিকি কামান, পুজোর ভোগ রান্নার ঘ্রাণ, দোতলার ঘরথেকে ভেসে আসা , মায়ের সনাতনী একচালার প্রতিমা আপনাকে মনে করিয়ে দেবে দাপুটে বাংলার অম্লান অতিত। সঙ্গীতের চর্চা দেববাড়িতে চিরন্তন। আজকের যুগের সঙ্গীত পরিচালক রাজা রাজনারায়ান দেব এই বাড়িরই ইতিহাসকে সস্মমানে বহন করছেন।












শুভজিৎ লাহা  (slaha666@gmail.com)

No comments:

Post a Comment