কলকাতা
পুরসভার গাঢ় সবুজ রঙের বোর্ডে লেখা লাটূবাবূ লেন। তার ঠিক পিছনে গাঢ় লাল রঙের
বাড়ি, রামদুলাল নিবাস, ছাতু ও লাটূর ঠাকুরবাটী। বাঙালীর বাবু কালচারকে এক ক্লাসিক
রূপকথার পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন উত্তর কলকাতা নিবাসী এঈ দুই মহাশয়। হাজার টাকার
নোট পুড়িয়ে সিগার ধরানো, ইংরেজ দোকানদারের অপমানে এক কথায়ে পুরো দোকান কিনে নেওয়া
সহ এমন হাজারো কর্মকাণ্ডের দলিল আছে ছাতু ও লাটু বাবুর নামের পাশে। তবে এই বাড়ি
যার নামে সেই ঈশ্বর রামদুলাল দত্ত, আশুতোষ ও প্রমথর বাবার শুরুটা ছিল একেবারে
শূন্য থেকে।
রামদুলাল কাজ করতেন মদনমোহন নামের এক ব্যক্তির
সান্নিধ্যে এক সাধারণ কর্মচারী রূপে। রামদুলালের উপস্থিত বুদ্ধি মদনমোহনকে আকৃষ্ট
করেছিলে। মদনমোহন বড় বাড়ির সন্তান, ধুরন্ধর ব্যবসায়ী। মানুষ চিনতে তাঁর ভুল হয়না।
একবার জাহাজ বেচাকেনার এক কাজে নিজে না যেতে পাড়ায় পাঠালেন রামদুলালকে। এক লক্ষ
টাকায়ে সেদিন এক ইংলিশম্যানকে জাহাজ বেচে ছিলেন রামদুলাল। লাভের টাকা মদনমোহন নিতে
অস্বীকার করেন। তিনি বললেন “এ তোমার টাকা, লাভে আমার অধিকার নেই, তুমি শুধু আমায়ে কেনা
দামটা দাও”। ব্যাস সেই শুরু। তারপর স্বাধীন আমেরিকায় প্রথম ভারতীয় ব্যবসায়ী রূপে নিজেকে
প্রতিষ্ঠিত করা থেকে শুরু করে পৃথিবী জুড়ে লোহা, ব্রান্ডি,
সামুদ্রিক মাছ, নীল এসবের আমদানি-রপ্তানি তথা বাংলার প্রথম লাখপতি হয়েছিলেন
বিদন ষ্ট্রীটের এই রামদুলাল দে।
এ বাড়িতে
দুর্গা পুজোর রোশনাই ই আলাদা। ৪০০ জন একসাথে নাট-মন্দিরে বসে পুজো দেখতেন সেই সময়ে।
পুজোর রোশনাই আরও বাড়ে আশুতোষ ও প্রমথর আমলে। বুলবুলির লড়াই,
কুস্তির আখড়া কি নয়। এখন চোখ ধাঁধানো ঝাড়বাতিটাই শুধু একা নাট-মন্দির আলো করে
আছে। পুরানবিধি মেনে শাক্ত, শৈব এর পাশাপাশি বৈষ্ণব মতেও দেবী পুজিতা হন। কুমারী পুজোর
রীতি আজও আছে, আর ভোগের রান্নায় নুনের অনুপস্থিতি। এখানেও দেবীর সখারা থাকেন দেবীর
পাশে, জয়া-বিজয়া। তৃতীয়ায়ে দেবীকে আসনে বসানো হয়। আর, ষষ্ঠী থেকে প্রতিপদ নিয়মিত শালগ্রাম
শিলা, পঞ্চদেবতা নবগ্রহ, এবং ৬৪ দেবদেবী একই সাথে পুজা-ভোগ পান। সরকারি নিয়ম মেনে ছাগবলি
প্রায় সারা দেশেই বন্ধ। কিন্তু এবারিতে ছাগবলি বন্ধ করেন রামদুলাল স্বাং। গল্প শোনা
যায়ে, একবার বলির প্রদত্ত ছাগ ছুটে এসে আশ্রয় নেয় রামদুলালের পায়ের কাছে। রামদুলাল
আদেশ দিলেন, “আজ থেকে মায়ের পুজোয়, পাঁঠাবলি বন্ধ। সবাই যে মায়ের সন্তান”। সেই শুরু।
তারপর থেকে আখ, চালকুমড়ো, শসা বলি হয় পুজোর তিন দিন। অতিতে জোড়া নৌকায়ে মাঝ নদীতে নিয়ে
গিয়ে দেবী বিসজন হত। কৈলাসের উদ্দেশে উড়ে যেত এক জোড়া নীলকণ্ঠ পাখি। এখন বিসর্জনে নীলকণ্ঠ
মূর্তি নিরঞ্জন হয়, জোড়া নৌকার রেওয়াজ এখন গল্পগাঁথায়ে।
- শুভজিৎ লাহা (slaha666@gmail.com)









No comments:
Post a Comment