‘বানিজ্যে বসতে লক্ষ্মী’। বাঙালীর এই প্রবাদ অক্ষরে অক্ষরে প্রত্যক্ষ করা যায় বনেদি ও জমিদার বাড়ির পুজো পরিক্রমায়ে। ১৭, ১৮ শতকে যে সব বাঙ্গালিই ব্যবসায় সফল হয়েছিলেন তাঁর প্রায় প্রত্যেকেই বাড়িতে দুর্গাপুজোর প্রচলন করেন। জোড়াসাঁকোর দুই দাঁ বাড়ি; শিবকৃষ্ণ ও নরসিংহ দাঁ-র বাড়ি গেলে অতিত ঐশ্বর্যের মৃদু আভার আন্দাজ পাওয়া যায়। আগেই বলেছি, প্রবাদ আছে মা গহনা পড়েন জোড়াসাঁকোর দাঁ বাড়িতে, কুমোরটুলির মিত্র বাড়িতে দ্বি-প্রাহরিক আহার সারেন, আর নৃত্যগীত উপভোগ করেন শোভাবাজারের রাজবাড়িতে। দুই দুঁদে ব্যবসায়ী বাঙালীর বাড়ির পুজো প্রত্যক্ষ না করতে পারলে কলকাতার সাবেকি পুজোদর্শন কখনই সম্পূর্ণ হয় না।
“ডাক রাং অভর চিকমিক ঝিকমিক করে।
তায় সোনালি রুপালি চুমকি বসান আলো করে।” (হু প্যা ন)
কালো,
মোটা, বেঁটেখাটো শিবকৃষ্ণ সারাক্ষণ ভরি খানেক সোনার
গহনা পড়ে থাকতেন। আচমকাই এক দিন সকালে কি মনে হল, শিবকৃষ্ণ ভাবলেন
দেবী দুর্গা কেও এভাবেই সাজাবেন। যেমন ভাবা তেমনি কাজ। সম্ভবত জার্মানি থেকে এসেছিল
স্বর্ণ-মানিক্য খচিত ভেলভেটের মেরুন শাড়ী। আর এ শুধু মায়ের জন্য নয়, তার চার ছেলে, মহিসাসুর এমনকি দেবীবাহন সিংহের জন্যও একই ব্যবস্থা। বিদেশ থেকে আনা
‘মেটালিক’ স্বর্ণালী পাতে সাজানো হয় একচালায়। আনুমানিক ১৫০ বছর ধরে প্রত্যেক
বছরে এই একই ভেলভেটের শাড়ীতে সেজে ওঠেন দাঁ বাড়ির ‘কন্যা’ দুর্গা। ১৮৪০
সালে সাতগাছিয়ার ব্যবসায়ী গোকুলচন্দ্র দাঁ, তাঁর আত্মীয়ের পুত্র ৪ বছরের শিবকৃষ্ণ দত্তকে পোশ্যপুত্র রূপে গ্রহণ করে কলকাতায়ে আসেন এবং এই বাড়ি
ও দুর্গাপুজোর পত্তন করেন। পরে এই পুজো শিবকৃষ্ণ দাঁর বাড়িরপুজো
রূপে বিখ্যাত হয়। শিবকৃষ্ণর রেলের লাইন নির্মাণের কাজে বেশ উন্নতি করেন এবং তাঁর
সময় থেকেই পুজোর জাঁক বাড়ে ১২এ শিবকৃষ্ণ দাঁ লেনে। বাড়ির পুজো
এখনো সনাতনী রীতিনীতি মেনে পালন করা হয়। রথযাত্রার দিন কাঠামো পুজো করা হয়। আগে শাল
কাঠে বানানো হত দেবীর কাঠামো এখন গরান কাঠে বানানো হয় দেবীর অস্থি। সন্ধিপুজোয় মেনে
চলা হয় এক বিশেষ রীতি। অধরলালের বাড়ির পুজোয় নারীরা থাকেন সামনে, তেমনি এবাড়ির পুজোয়
তাঁরা থাকেন নেপথ্য। সন্ধিপুজোর সমস্ত কাজ সামনে থেকে, সঙ্গে থেকে পরিচালনা করে বাড়ির
পুরুষেরা, বাড়ির ছেলে, জামাই সকলে। আর পাঁচটা জমিদার বাড়ির মতো এবাড়ির বৈঠকখানাও এখনো
যেন সেই ১৮০ বছর আগেকার ইংরেজ আমলেই আটকে আছে। বৈঠকখানার দেওয়ালও
জড়িয়ে রয়েছে এক আশ্চর্য প্রাচীন বৈশিষ্ট্য। এবাড়ির বৈঠকখানার দেওয়াল এক দর্শনে সাধারণ
মনে হলেও আদতে তা কিন্তু পুরু ধাতব পাতের তৈরি।
- শুভজিৎ লাহা (slaha666@gmail.com)
- শুভজিৎ লাহা (slaha666@gmail.com)









No comments:
Post a Comment