‘বানিজ্যে বসতে লক্ষ্মী’। বাঙালীর এই প্রবাদ অক্ষরে অক্ষরে প্রত্যক্ষ করা যায় বনেদি ও জমিদার বাড়ির পুজো পরিক্রমায়ে। ১৭, ১৮ শতকে যে সব বাঙ্গালিই ব্যবসায় সফল হয়েছিলেন তাঁর প্রায় প্রত্যেকেই বাড়িতে দুর্গাপুজোর প্রচলন করেন। জোড়াসাঁকোর দুই দাঁ বাড়ি; শিবকৃষ্ণ ও নরসিংহ দাঁ-র বাড়ি গেলে অতিত ঐশ্বর্যের মৃদু আভার আন্দাজ পাওয়া যায়। আগেই বলেছি, প্রবাদ আছে মা গহনা পড়েন জোড়াসাঁকোর দাঁ বাড়িতে, কুমোরটুলির মিত্র বাড়িতে দ্বি-প্রাহরিক আহার সারেন, আর নৃত্যগীত উপভোগ করেন শোভাবাজারের রাজবাড়িতে। দুই দুঁদে ব্যবসায়ী বাঙালীর বাড়ির পুজো প্রত্যক্ষ না করতে পারলে কলকাতার সাবেকি পুজোদর্শন কখনই সম্পূর্ণ হয় না।
২০
এ বিবেকানন্দ রোড, কলকাতা- ৬। রাস্তার ওপর লালরঙা বাড়ি। পরিচয় বন্দুক বিক্রেতার
বাড়ি। এ বাড়ির দুর্গাপুজো বন্দুকবাড়ির দুর্গাপুজো বলে খ্যাত। উত্তাল ভারতে যখন
ইংরেজদের রাজ। তখন তাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করে বন্দুকের ব্যবসায় নাম
কাড়েন নরসিংহ দাঁ। প্রথমে রিসড়া, পরে কলকাতায়ে কারখানার স্থানান্তর ঘটে। ১৮৫৯-এ এই
পুজোর সূচনা হয়। সূচনা করেন নন্দলাল দাঁ। এখনো ঠাকুরদালানে এসে দাঁড়ালে দাঁ বাড়ির
পূর্ব ঐতিহ্যকে অনুভব করা যায়। ঠাকুরদালানের লাগোয়া দেওয়ালে পূর্বপুরুষদের
তৈলচিত্র, হরেক রকম বন্দুকের স্পেসিমেনের ছবি আপনাকে তাক লাগিয়ে দেবে। তবে
দাঁয়েদের প্রথা মেনে এপুজোর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ দেবীর অঙ্গসজ্জা। হরেক বনেদি গহনা
এমন সম্ভার অনেক মিউজিয়ামের সম্পদকেও হেলায় হার মানাতে পারে। হার মানা হারের এই লিস্টে
কি নেই? আছে সীতাহার, সাতনরী, ললন্তিকা চেন আরও কতও কি। আজনুলম্বিত সেই সব গহনা
ছাড়াও আছে সোনার চাঁদমালা, মুকুট, টায়রা, টিকলি, চুড়, চুড়ি, বাউটি, মানতাসা।
জোড়াসাঁকোর দুই দাঁ বাড়ির পুজোই তাঁর সমস্ত রীতিনীতি মেনেচলে আজও। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, যে কারনে এই সাবেকি পুজোর ইতিহাস এত দৃঢ়, সেই চালচিত্রের সোনার গহনা, মানিক্য খচিত দেবীর কাপড়, অঙ্গসজ্জা, পূজোর নিয়ম নীতি, ভোগ পরসাদ এই সবকিছু আজও একইভাবে প্রাসঙ্গিক, ও অমলিন তাঁদের উত্তরপুরুষদের হাত ধরে।
- শুভজিৎ লাহা (slaha666@gmail.com)








No comments:
Post a Comment