ইতিহাস সর্বদাই জীর্ণ। আমাদের কল্পনা আর অতিত স্মৃতি তাঁকে প্রাণ দেয়। অধিকাংশ ইতিহাসই নখ-দাত-চর্বি হারিয়ে কঙ্কালসম দাড়িয়ে থাকে। কলকাতার বনেদি বাড়ির পূজো অধিকাংশই তাই। কতগুলো প্রাচীন রীতি, নিয়ম, অতিত স্মৃতি নিয়ে স্ম্রিয়মান। কিন্তু যখন ইতিহাস শুধু কঙ্কাল নয়; নখ-দাত-চর্বি আর পালিশ করা জুতোয় জ্বলজ্বল করে তখনতা শুধু চমকেই দেয় না, আশ্চর্য করে। যদি তেমন আশ্চর্য হতে চান, তবে আপনার গন্তব্য হওয়া উচিত ৪৭ পাথুরিয়াঘাটা স্ট্রীট, দেওয়ান খেলাৎ ঘোষের বাড়ি।
তবে শুরুটা করি রামলোচন ঘোষের বাড়ির পুজো দিয়ে। একেবারে পাসের বাড়ি, ৪৬ পাথুরিয়াঘাটা স্ট্রীট। রামলোচন ঘোষ, সম্পরকে খেলাৎ ঘোষের দাদু। ১৭৮৩ তে এই বাড়িতে দুর্গা পুজোর পত্তন করেন। তারপর ঐতিহাসিক সেই দুর্গা পুজোর সাক্ষী থেকেছেন তাঁবড় তাঁবড় শিল্পী ও গূণী মানুষেরা। ধ্রুপদী সংগীতের রাণী কেসরবাঈ, ওস্তাদ বড়ে গুলাম আলী, আলাদীয়া খান, গহরজান, আব্দুল করিম খানের মত শিল্পীরা এসে মজলিস বসাতেন এই ৪৬ পাথুরিয়াঘাটা স্ট্রীটে। পূজোর ক’দিন যেন নন্দনকাননের আসর বসত রামলোচনের তট্বাবধানে। লর্ড ওয়াড়েণ হেসটিনস স্বস্ত্রীক এসেছিলেন এই পূজো দেখতে। সংগীতের এই মহাধামে কান পাতলে এখনো শোণা যাবে পূজো-ষ্পেশাল ঢাক আর সানাইয়ের অনবদ্য যুগলবন্দী। যদিও সেইঘর সেই বারান্দা আজও আছে আগের মতোই, কিন্তু ফেলে আসা সময়টা বন্দী হয়ে আছে অমলিন কিছু স্মৃতি আর সাজানো ফোটো ফ্রেমে।
কিন্তু একবারেই জৌলুশ হারায়নি, প্রপৌত্র খেলাত ঘোষের রাজ নিবাস। ৮৫ ফুটের লম্বা মার্বেলের করিডোর বানিয়েছিল সেই শতকের সেরা জার্মান কোম্পাণী মারটিন এন্ড বার্ন। এতো বড় ঠাকুর দালান কোলকাতায়ে তো দূরস্থান সারা ভারতবর্ষে মিলবে কিনা সন্দেহ। মঠচৌরী মতে নির্মিত হয় এবাড়ীর প্রতিমা। পড়নে ডাকের সাজ, আর চালচিত্রে কালী, কৃষ্ণ প্রভৃতি দেবদেবী আর অসংখ্য লোকগাথার গল্প। সামনের সিঁড়ী বেয়ে যদি ওপরে যাবার সুযোগ মেলে, তবে চোখের সুখে আশ মিটিয়ে নিতে পারেন খাঁটী বেলজীয়াম কাঁচের ঝাড়লন্ঠন, থমসন কোম্পাণীর খাস গ্র্যান্ডফাদার ক্লক, নরম মখমলের ফরাস এবং আরও অনেক দুষ্প্রাপ্য শিল্পসামগ্রীকে প্রত্যক্ষ করে। সবচেয়ে আশ্চর্য হতে হয় উঠোনের মার্বেল মূর্তি গূলো চাক্ষুষ করে। মার্বেল পাথরের ঘর্মাক্ত গা দেখে মনে হবে যেন সদ্য জার্মানি থেকে বানিয়ে আনানো। এই বাড়ির সৌন্দর্য, সম্পদ আর তার সাথে পাল্লা দিয়ে ভীড় করা অজশ্র অতীতগাঁথা, যার কোনটা সত্যি কোনটা হয়ত রূপকথা, কিন্তু তা পলকে বড্ড বেশী মূর্ত হয়ে ওঠে বাড়ির নাটমন্দিরে এসে দাঁড়ালে। মঠচৌরী মতে নির্মিত হয় এবাড়ীর প্রতিমা। পড়নে ডাকের সাজ, আর চালচিত্রে কালী, কৃষ্ণ প্রভৃতি দেবদেবী আর অসংখ্য লোকগাথার গল্প।






















No comments:
Post a Comment