২রা মে, ২০২০। ইজিপ্টে মারা গেলেন সাঈদ হাবাশ; দুবছরেরও বেশি সময় বিনা বিচারে জেলে থাকার পর। কি অপরাধ? মিশরের রাষ্ট্রপতি, আল-সিসিকে বিদ্রুপ করে বানানো মিউজিক ভিডিওর নির্দেশনা দিয়েছিলেন তিনি। মারা যাবার আগে, হাবাশ লিখেছিলেন, “মানসিক মৃত্যু আমার আগেই হয়েছিলো”।
২৫ শে মে, ২০২০। মিনিয়েপোলিশ। ৪৬ বর্ষীয় ‘কৃষ্ণাঙ্গ’ জর্জ ফ্লয়েডকে হাঁটু দিয়ে গলা টিপে হত্যা করেন এক পুলিশ কর্মকর্তা। তোলপাড় করা এই ঘটনার ভিডিও মুহূর্তে ছড়িয়ে পরে সোশ্যাল সাইট এবং মিডিয়ার ব্রেকিং নিউজে।
২৩ শে জুন, ২০২০। মারা গেলেন তামিলনাড়ুর পি জয়রাজ, ও তাঁর ছেলে জে ফেনিক্স। লকডাউনের নিয়ম ভেঙ্গে দোকান খোলা রাখার কারণে তাঁদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়। গনমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, পুলিশি হেফাজতে থাকাকালিন চরম নৃশংস যৌন অত্যাচারের শিকার হন এই দুজন। ফেনিক্সের এক বন্ধুর বয়ান আরও সাঙ্ঘাতিক। ২০ শে জুন, সকাল ৭টা থেকে রাত ১২টার মধ্যে ৭ বার লুঙ্গি পরিবর্তন করতে হয় তাঁদের। কারন; যৌন নৃশংসতার জন্য প্রতিটি লুঙ্গির মলদ্বার সংলগ্ন স্থান অতিরিক্তভাবে রক্তভেজা ছিল।
তিনটে ঘটনার মিল গুলো লক্ষ করুন। মিলটা হল, প্রতিটি ঘটনাই লকডাউন সমকালীন, বা লকডাউন পরবর্তী সময়ের। আরও মজার ব্যাপার হল, হ্যা মজার! প্রতিটি ঘটনাই ক্ষমতার বেয়াব্রু, আবডালহীন প্রদর্শন। স্বৈরতন্ত্রের নির্লজ্জ প্রকাশ; সে প্রশাসন, রাষ্ট্র বা যাইহোক, এক কথায় তাকে ‘ক্ষমতা’ই বলে।
আরেকটু ঝেড়ে কাশা যাক থুড়ি ব্যাপারটা আরেকটু পরিষ্কার করা যাক। একটু গুছিয়ে সাজিয়ে নিই। সরকারী নির্দেশ অনুসারে, হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রীর কথাই আপাতত দেশের শেষ কথা বলে মেনে নিতে হবে। ইস্রায়েলের প্রধানমন্ত্রী আদালত বন্ধ করে দিয়েছেন ও নাগরিকদের একটি অনুপ্রবেশমূলক নজরদারি শুরু করেছেন। চিলি পাব্লিক স্কোয়ারে সেনাবাহিনী পাঠিয়েছে; যুক্তি, তাঁরা সম্ভাব্য বিক্ষোভকারীদের দখলে রাখতে চায়। এবং বলিভিয়া পরবর্তী নির্বাচন স্থগিত করেছে। সব কটি ঘটনার মিল একটাই, রাষ্ট্র, আরও ভালভাবে বললে, রাষ্ট্রনায়করা এখানে শেষ কথা, এবং ঢাল বেচারা কোভিড-উনিশ।
আরও কিছু সমান্তরাল নমুনা পেশ করা যাক। পৃথিবী ব্যাপী শক্তিশালী রাষ্ট্র নায়কদের লম্বা লিস্ট। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ব্রিটেনের বরিস জনসন, চীনের জিনপিং, রাশিয়ার পুতিন, স্পেনের পেড্রো স্যাঞ্চেজ, ব্রাজিলের জের বোলসোনারো এবং ভারতের নরেন্দ্র মোদি। এদের মিলটা কোথায়? উত্তর; এদের দেশপ্রেমে উগ্র জাতিয়তাবাদ স্পষ্ট। দেশের সাফল্যকে এরা নিজের সাফল্য বলতেই বেশী পছন্দ করেন। পৃথিবীজুড়ে একাধিক সমীক্ষা এদের জনপ্রিয় ও শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব বলে প্রচার করে এসেছে। এরা প্রায় সকলেই অতি দক্ষিণপন্থি ভাবধারার শাসক। এবং মজার ব্যাপার হল, করোনা মোকাবিলায় এরা প্রত্যেকেই কমবেশি ব্যর্থ। কারণ কি? খুব পরিষ্কার। দেখা গিয়েছে, এনারা এনাদের পছন্দসই অ্যাডভাইসর গোষ্ঠীর কথাই মেনে চলেছেন। যা এনাদের কথার প্রতিধ্বনি ছাড়া আর কিছুই নয়। কোনও ঠিকঠাক এক্সপার্ট গ্রুপ, বিশেষজ্ঞ মেডিকেল প্রফেশনাল, বিজ্ঞানীদের প্যানেল এদের ছিলনা। ফলতঃ, ডিসিশন ও কাউন্টার ডিসিশনের যে চিরাচরিত নিয়ম সেটা মানতে হয়নি এদের। যার ফলাফল, একটা চরম বিপর্যস্ত এবং অবাঞ্ছিত আধুনিক সময়।
এবার কিছু করোনা-পরিসংখ্যান দেওয়া যাক। এই মুহূর্তে দেশের কোভিড আক্রান্তের সংখ্যা ৫ লক্ষের কিছু বেশী, যার মধ্যে ৩ লক্ষ মানুষ সেরে উঠে বাড়ি ফিরে এসেছেন। মারা গিয়েছেন প্রায় ১৬ হাজার। বাকি পরিসংখ্যান কি বলছে? এক বছরে ভারতে পথ দুর্ঘটনায় মারা যান প্রায় ১.৫ লক্ষ মানুষ; ডায়াবেটিস ও আত্মহত্যায় সংখ্যাটা যথাক্রমে ৩ ও ১.৩ লক্ষ। ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, হার্ট-অ্যাটাকের মতো জলভাত রোগের ক্ষেত্রে সংখ্যাটা মোটেই হেলাফেলার নয়; করোনায় মৃত্যুর থেকে প্রায় কয়েকগুণ বেশী। তবে? করোনাকে কি ভয় পাবো না, ভয় কি পাবো না আমরা?...কিন্তু বিজ্ঞান যে বলছে...?
কি বলছে বিজ্ঞান? সাধারণ মানুষের রিপোর্ট অনুযায়ী, মার্চের প্রথম সপ্তাহে বিজ্ঞান বলেছিল যে ভারতবর্ষ গরমের দেশ, করোনা এদেশে টিকবে না। আহা, শিবদাস ব্যানার্জির গানটা মনে পরে যায়, ‘ভারতবর্ষ সূর্যের এক নাম, আমরা রয়েছি সেই সূর্যের দেশে’। মার্চের চতুর্থ রবিবারে বিজ্ঞান বুঝিয়েছিল কিভাবে একদিনের কার্ফুতে করোনা চেইনটা ভেঙ্গে যাবে। হালে সূর্যগ্রহণের সাথে করোনা উপসর্গের একটা বিজ্ঞান ভিত্তিক সমীকরণ জনতার মধ্যে বেশ প্রভাব ফেলেছে। “Solar Eclipse 2020: Can Surya Grahan kill coronavirus? Find out what science says” এটি ছিল একটি প্রখ্যাত ইংরিজি দৈনিকের হেডলাইন। বিজ্ঞান আর অবিজ্ঞানের তফাৎ যারা বলেন যুক্তি, তাঁরা ভুল বলেন। কারণ, যুক্তিটা অবৈজ্ঞানিকও হতে পারে। আধুনিক স্বাস্থ্য-বিজ্ঞানের পরাকাষ্ঠা বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থা কি বলছে? এক দিনের ব্যবধানে দুটি পরস্পর বিরোধী মন্তব্য। একবার বলে, উপসর্গহীনরাই করোনা ছড়িয়ে যাবার মস্ত কারণ; পরের দিনের মন্তব্যে একই কারণটা “very rare” ও তার পরের দিন “unlikely” হয়ে যায়। এছাড়াও আরও হাফ ডজন অসঙ্গতির কথা উল্লেখ করাই যায়। তাহলে, লড়াইটা বিজ্ঞান আর অবিজ্ঞানের নয়; বিজ্ঞান আর রাজনীতির। তবে, একটি বৈজ্ঞানিক আর একটি রাজনৈতিক বক্তব্যের পার্থক্য কোথায়? “পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘোরে”- একটি বৈজ্ঞানিক বক্তব্য। আর, চারশো বছর আগে গ্যালিলিও চার্চের নির্দেশে বলতে বাধ্য হলেন, “সূর্য পৃথিবীর চারিদিকে ঘোরে”। একটি রাজনৈতিক বক্তব্য, আরও পরিষ্কার করে বললে ক্ষমতার প্রভাবে প্রভাবিত বক্তব্য।
ক্ষমতা চিরকালই চেয়েছে তার অধিনস্তকে মুক করে রাখতে। আজকের সময় তাকে অন্ধ-বধিরও করে দিতে চায়। আপনি ততটাই জানবেন যতটা ক্ষমতা আপনাকে জানাতে চায়। ততটাই দেখবেন, যতটা সে দেখাবে। তবুও না-দেখার মেঘটার আড়ালে যে সত্য লুকিয়ে আছে তা যখন মাঝে মাঝে নগ্ন হয়ে যায়; তাতে পরিস্কার দেখা যাছে, এই করোনা-কালীন সময়কে ঢাল করে বিশ্বজুড়ে নেতারা নির্বাহী ক্ষমতা গ্রহণের ‘আবেদন’ করছেন এবং প্রায় কোন প্রতিরোধ ছাড়াই কার্যত স্বৈরাচারীর কর্তৃত্ব দখল করছেন। শুধু তাইই নয়, তাঁদের কর্তৃত্ব এখন প্রতি মুহূর্তে তাঁর সমাজকে, আপনাকে মেপে নিছে। আপনি চায়ে ক’চামচ চিনি খান, বংশে হাঁপানি আছে কিনা, শুতে যাবার সময় কোন দিকে মাথা করেন, পঁচিশে বৈশাখে পাঞ্জাবী পড়েন কিনা, পছন্দের ফুল কি? জবা, নয়নতারা না পদ্ম কিম্বা আপনার বড়শালির বাড়ি কোথায়? বড়গাছিয়া না বাঘাযতীন...সওওব। আপনাকে সুরক্ষিত করার নামে আপনার এই সকল খুঁটিনাটি ভাল-মন্দ লাগা তাঁদের নখদর্পণে। আরও মজার ব্যাপার, এই ক্ষমতাকে আপনি যদি শুধুই রাষ্ট্র ভাবেন তাহলে মস্ত ভুল করবেন। এই ক্ষমতা সকল ফর্মে, সব রকম ফরম্যাটে আপনাকে নজরবন্দি করে রেখেছে, সে আপনি বাড়িতেই থাকুন বা মেসে। ক্ষমতা শুধু তাঁর রূপ বদলে যাছে, কখনো সে সহকর্মী, কখনো বাড়িওয়ালা, আবার কখনো সরকার। এখন আপনি ভাববেন, ধুর তাও আবার হয় নাকি? কি লাভ এসব করে? কারণ এরাই ঠিক করবে আপনি কি করবেন, কি পড়বেন, কোথায়ে যাবেন? পিএইচডি করে কলেজে পড়াবেন, না বেনারসি পানের দোকান দেবেন, তা ঠিক করে দেবে এরাই। আপনি সতর্ক হন। প্রসেসটা কিন্তু শুরু হয়ে গেছে। সরকার নাক-মুখ ঢাকতে বলেছে, চোখ-কান নয়। এককালে যাদেরকে রেপ্রেসেনটেটিভ ভেবেছিলেন, তাঁরাই এখন ডিসিশন-মেকার। তাঁরা এখন আপনাকে গ্রাহ্যই করেনা কারণ ঐ যে, কাউন্টার ডিসিশন তাঁদের পছন্দ নয়।
এটা কি রাজনীতি বিরোধী লেখা? মোটেই নয়। এটা রাজনৈতিক লেখা। সব মানুষই রাজনৈতিক, কেউ অ-রাজনিতিক নন। আর কোন একটি বিশেষ রাজনৈতিক দল বা মতাদর্শকে মেনে বা মেনে না চলার সঙ্গে এর কোনও সম্পর্ক নেই। এই লেখা বিশেষ কোন রাজনৈতিক দলের বিরোধীও নয়; বিশ্ব জুড়ে ক্ষমতার যে আগ্রাসন, এই লেখা তার বিরুদ্ধে, গনতন্ত্রের পক্ষে।
আপনি কি ভয় পেলেন? হ্যাঁ প্রচণ্ড। কারণ, কোনোদিন অফিস থেকে ফিরে এসে দেখলেন বাড়ি রং করার জন্য গোডাউনে ডাই করে রাখা সব বই গুলো আপনার বউ বেচে দিয়েছে আর উত্তরে বলছে “ওই বই গুলোতো তুমি পড়তেই না, শুধু আবর্জনা হয়ে পড়েছিল”। মশাই, ভয়টা পেলে বিক্রি হয়ে যাবার আগে পাওয়াই ভালো, তাই নয় কি?
- শুভজিৎ লাহা (slaha666@gmail.com)
তথ্যসূত্রঃ ইন্টারনেট
বি:দ্রঃ লেখকের মতামত একান্ত ব্যক্তিগত