ভুমিকা

১৮২৭, ২০ শে সেপ্টেম্বর।
হাটখোলার দত্তবাড়ি। বাড়ির বাবু স্নানে যাছেন। বেটেখাটো পঞ্চাশ ঊর্ধ্ব মানুষটির নোয়াপাতি ভুড়ি, দুহাতের কব্জিতে সোনার তাগা, গলায়ে দু-নরী সোনার হার, হাতে পুরনো গোল তাসের মতো চ্যাপ্টা সোনার কবচ। কোমরের সোনার গোঁট ৩-ইঞ্চি ঝুলে হাওয়ায় দোল খাছে। বাবুর সঙ্গে নয়-দশ জন দাসিবাদী। তাদের কারোর হাতে শৌচের গোলাপ জল, কারোর হাতে হাতির দাঁতের চিরুনি, লন্ডন থেকে আনা মাথায় মাখার সুগন্ধি তেল। কেউবা মেলে রয়েছে পাড়-ছেঁড়া ঢাকাই কাপড়; স্নান শেষে বাবু মাথা মুছবেন বলে।
বাবু স্বল্পভাষী, শিক্ষিত, ও ইংরাজি জানেন। নিন্দুকেরা তাঁকে ইংরেজের চামচ, স্মেলেচ্ছ-রা পদলেহন কারী কুত্তা, আর ভদ্রলকেরা তাঁকে ‘রায়বাহাদুর’ বলে থাকেন। স্নান-এ যাবার আগে বাবুর অভ্যেস সংবাদপত্রে একবার চোখ বুলিয়ে নেওয়া। নিয়ম করে তাঁর বাড়িতে দুটি সংবাদপত্র আসে। প্রথমটি বাংলা, শ্রীরামপুরের মিশনারিদের কাগজ, ‘সমাচার দর্পণ’ এবং অন্যটি ‘Calcutta Gazette’। এ পাতা ও পাতা করতে করতে হঠাৎ একটা অন্যরকমের বিজ্ঞাপন বাবুর নজর কাড়ল। শিরোনাম ‘দ্য গ্রেট নচেস’; অর্থাৎ ‘একটি বিরাট নৃত্যসভা’। পরের ছত্রে লেখা, আগামী ২০-২৯ শে সেপ্টেম্বর চুঁচড়োর প্রানকৃষ্ণ হালদারের বাড়ির দুর্গাপুজো উপলক্ষয়ে ৯দিন ব্যাপী বিরাট নৃত্য আসরের আয়োজন হয়েছে। কলকাতার নামজাদা, বিত্তবান বনেদিরা নিমন্ত্রিত হয়েছেন। সঙ্গে জোড়া একটি বিঃ দ্রঃ। তাতে লেখা আছে যারা যারা ‘টিকিট’ (অর্থাৎ কার্ড) পাননি তারাও স্বাগত। দুত্তবাবু শ্লেষ বুঝতে পারলেন। অপমানে বাবুর কানের লতি গোলাপের মতো লাল হয়ে উঠল। গোলাপ জল পড়ে রইল। স্নান আর করা হল না।

১৮২৯, ১২ ই মার্চ।

‘গেজেট’ পত্রিকা লিখছে, প্রাণকৃষ্ণ হালদার সুপ্রিম কোর্টর নির্দেশে দ্বীপান্তরে যাছেন। অভিযোগ; মিথ্যে কাগজ দেখিয়ে ৫০/৬০ লক্ষ টাকার জালিয়াতি। সেই বছরেরই ২৭শে জুলাই প্রাণকৃষ্ণ হালদারের সম্পত্তির নিলাম ডাকল মেসার্স ম্যাকেঞ্জি লায়াল অ্যান্ড কোং। সম্পত্তির তালিকার বিজ্ঞপ্তিতে ছিল চুঁচড়ার ৬ টি ও কলকাতার ৮ খানা মস্ত মস্ত বাড়ি। দত্ত বাবু লোক পাঠালেন। উকিল তিনটি বাড়ির দলিল আর চন্দননগরের মিষ্টি নিয়ে ফিরে এলেন। সেবছরই তারই একটিতে রমরমিয়ে দুর্গাপূজা করলেন হাটখোলার দত্ত বাবু। পুজোর দিন, অষ্টমীর রাতে, ভদ্রোলোকেরা এসেছিলেন ‘বিদ্যাসুন্দর’ নাটক দেখতে। সঙ্গে ছিল এলাহি ‘টিফিন’-র ব্যবস্থা। নিন্দুকেরা অবশ্য রটিয়েছিলেন সেদিন নাকি মটন চপ আর বিফস্টেকের ঢালাও ব্যবস্থা ছিল, সঙ্গে ব্রান্ডি, স্যাম্পেন ও সেরি। স্মেলেচ্ছ-রা বলেছিল, সেদিন রাতে নাকি যাত্রার নাম করে খ্যমটা নেচেছিল বছর ষোলোর দুই ছুকড়ি। জুড়িগাড়ির চালকদের মুখে মুখে সে গান অনেক দিনে ফিরেছিল; “মদন আগুন জ্বলছে দ্বিগুণ, কল্লে কি গুণ ঐ বিদেশি”।

মজার ব্যপার, এই চুঁচড়োই ছিল বারোয়ারি পুজোর মাদারল্যান্ড। তবে গুপ্তিপাড়ায় এর খ্যাতি ছিল আরও বেশী। অস্টাদশ শতকের শেষের দিকে সে নেশা ছড়ায় বল্লভপুর, কোন্নগর, উলা, চাকদা ও শ্রীকুর হয়ে কলকাতায়। আর ১৯০ বছর পর সেই কলকাতাই বারোয়ারি পুজোর মহাপীঠ। বারোয়ারি পুজোর ইতিহাস, চাঁদা আদায়ের জুলুমের নানান কিসসা বিবৃত আছে শ্রীপান্থ-র ‘কলকাতা’ ও কালীসিংহীর নকশায়। কথিত আছে, দুঁদে পেটন সাহেব একবার পালকি নিয়ে রানী সেজে বেহালার বারোয়ারিতলায় জুলুমকারিদের হাতেনাতে ধরেছিলেন। যাইহোক, এ মুখগ্রন্থের (Facebook) বিষয় বারোয়ারি নয়, এই পত্রে (Page) বারোয়ারির বারো কল ছেড়ে বনেদির আদিতেই মন দেব আমরা। ২০১৯ এ এসে, ছড়ায়-ছবিতে, কথায়-কাহিনীতে ছুঁয়ে দেখব কলকাতার বনেদি পুজোগুলো কে।
তথ্যসুত্রঃ
১। ‘কলকাতা’; শ্রীপান্থ।
২। হুতোম প্যাঁচার নক্সা; কালীপ্রসন্ন সিংহ

শুভজিৎ লাহা  (slaha666@gmail.com)

No comments:

Post a Comment