ভারতের আধুনিক বিজ্ঞানের সর্বপ্রথম স্বপ্নদর্শী হিসেবে যাঁর নাম সর্বজনবিদিত তিনি ডঃ মহেন্দ্রলাল সরকার। হাওড়ার জগৎবল্লভপুরের পাইকপাড়া গ্রামে ১৮৩৩ এর ২রা নভেম্বর জন্মগ্রহন করেন ডঃ মহেন্দ্রলাল সরকার। পিতৃ-মাতৃ বিয়োগ তাঁর জ্ঞান অর্জনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি কোনোদিন। মাতুলালয়ে থেকেই একে একে সাফল্যের সঙ্গে পার করেন হেয়ার স্কুল, হিন্দু কলেজের (বর্তমানে প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়) গন্ডি। হিন্দু কলেজে স্বাধীনতাকামী তরুণ ছাত্রদের জাতীয় আন্দোলন তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করলেও, বিজ্ঞান তাঁর ধ্যানকেন্দ্রেই রয়ে গেছিল।

হাতে কলমে বিজ্ঞান শেখার তীব্র ইচ্ছায় বেছে নিয়েছিলেন তদকালীন একমাত্র গন্তব্য - কলকাতা মেডিকেল কলেজ। সেখানেও সাফল্য - ১৮৬০ এ চিকিৎসাবিদ্যায় স্নাতক এবং ১৮৬৩ তে ডক্টর অব মেডিসিন। বিজ্ঞান যেমন অদম্য, একটি প্রশ্নের উত্তর জন্ম দেয় আর একটি নতুন প্রশ্নের, ঠিক তেমনি ছিল ডঃ সরকারের মন। ব্যবসায়ী রাজেন্দ্রলাল দত্তর উৎসাহে অ্যালোপ্যাথি ছেড়ে হোমিওপ্যাথি চিকিতসার জগতে পা রাখেন, যার ফলস্বরূপ ব্রিটিশ মেডিকেল এসোসিয়েশন থেকে তাঁকে পদত্যাগ করতে হয়, যেখানে তিনি একসময় secretary ও vice-president এর পদে আসীন ছিলেন। পথ পরিবর্তনেও তাঁর কাঙ্খিত সাফল্য সীমাবদ্ধ হয়ে যায়নি। শোনা যায়, ১৮৭৫ সালে তাঁর আনুমানিক পারিশ্রমিক ছিল ৫০০ টাকা, যা হোমিওপ্যাথি চিকিতসাতেও তাঁর অনায়াস দক্ষতার পরিচায়ক।
 |
| Sri Ramakrishna |
 |
| Shyampukur Bati, 55, Shyampukur Street, Kolkata -4 |
এই চিকিৎসা বিজ্ঞানই তাঁকে পরিচিত করায় ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ দেব এর সঙ্গে। মাথুরামোহন বিশ্বাস তাঁকে ঠাকুরের চিকিৎসার জন্য দক্ষিনেশ্বর এ আসার অনুরোধ জানান। এরপর, ১৮৮৫ সাল থেকে ডাক্তার আর ঠাকুরের কথোপকথন কথামৃতের ছত্রে ছত্রে। ঠাকুরের প্রতি তাঁর টানকে 'Heart এর কথা Heart ই জানে' বলে ব্যাখ্যা দিলেও, পরমহংসদেবকে দেখেতে গিয়ে সময় এর প্রতিকূল্যে অন্য রোগীদের বিনা পারিশ্রমিকে চিকিৎসা বা ঠাকুরের কাছে রাত তিনটের সময় তাঁর কথা ভাবার সরল স্বীকারোক্তি, ঠাকুরের প্রতি তাঁর গভীর প্রেমের পরিচায়ক। তিনি শ্যামপুকুর বাটি তে ঠাকুরের গলার ক্যান্সারের চিকিৎসা করতে এসে সর্বসমক্ষে বলেছিলেন 'As man I have the greatest regard for him'! 'টাকার সঠিক ব্যবহার', 'অহংকার নয়, বিদ্যার আমি ভালো'- এইসব ঠাকুরের আশীর্বাদ স্বরূপ উপদেশ ছিল তাঁর প্রাপ্তি।
.png) |
IACS main entrance in Jadavpur, Kolkata
|
এই জীবনদর্শনে সঠিক ভাবে ভাবিত হয়েছিলেন বলেই হয়তো আজ কলকাতার বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে তাঁর মানস সন্তান 'Indian Association for Cultivation of Science (IACS)'. ১৮৭৬ এর ২৯শে জুলাই বউবাজার স্ট্রিটে রাজ্যপাল স্যার রিচার্ড টেম্পল এর দেওয়া ঠিকানায় পথ চলা শুরু করে IACS.
 |
IACS Old Campus
|
বিজ্ঞান এর প্রসারের জন্য সম্পূর্ণ ভারতীয় কর্তৃক পরিচালিত একটি সংস্থা নির্মাণ ও তাকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রচেষ্টার ছবি ধরা পরে ১৮৬৯ সালে The Calcutta Journal of Medicine -এ ডঃ সরকারের লেখা একটি প্রতিবেদন থেকে। IACS পথ চলা শুরু করে ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর, কেশব চন্দ্র সেন দের মতো বিশিষ্ট ব্যাক্তিত্ত্বদের হাত ধরে। পরবর্তী কালে অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু, স্যার আশুতোষ মুখার্জী, রায় বাহাদুর চুনিলাল বোসের মতো বিশিষ্ট বিদ্বজনেরা। IACS তার শিখরে পৌঁছয় কর্মরত বিজ্ঞানী CV Raman এর গবেষণার স্বীকৃতির মাধ্যমে, যা ভারতবর্ষ তথা এশিয়ায় বিজ্ঞানে সর্বপ্রথম সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। ১৯৩০ এর এই সাফল্য হয়তো জ্ঞানচক্ষুতে আগেই দেখেছিলেন এই বিজ্ঞানেই সাধক। |
| Professor C V Raman received the Nobel Prize in Physics in 1930 for his work done from this institute on the scattering of light and for the discovery of the effect named after him |
 |
| Professor Raman used this simple innovative instrument which led to the discovery of RAMAN EFFECT |
১৯০৪ এর ২৩শে ফেব্রুয়ারী তাঁর অন্তিম শয়ানের আগে ধৰ্ম আর বিজ্ঞানকে মিলিয়ে দিয়ে তিনি বলে যান - “I have only now to reiterate my conviction that if our country is to advance at all and take rank and share her responsibilities with the civilized nations of the world, it can only be by means of Science or positive knowledge of God’s work.”
 |
| Indian Association for the Cultivation of Science (IACS) Campus |